।। এস এম জামান ।। দরজায় কড়া নাড়ছে ঈদ। তাই ঈদ আনন্দ এখন সকলের ঘরে ঘরে। চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশাজীবির মানুষরা পরিবার-পরিজন নিয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী ঈদের কেনাকাটায় ব্যস্ত। শুধু ঈদ আনন্দ নেই প্রান্তিক ক্ষুদ্র কৃষকের ঘরে। উত্তরের জেলায় মাঠের ধান এখনও পাকেনি। এসব ধান ঘরে তুলতে এখন দুই সপ্তাহ লাগবে। ফলে এবারে কৃষক পরিবারের বাচ্চাদের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে গেছে। এখনও কেনা হয়নি নতুন জামাকাপড়।
সূত্রমতে, প্রতিবছর ঈদুল ফিতরকে ঘিরে চাঙ্গা হয় গ্রামীণ অর্থনীতি। এবারে মাঠেই পড়ে রয়েছে কাঁচা ধান। যা পাকতে এবং ঘরে তুলতে সময় লাগবে আরো ১৫ থেকে ২০ দিন। কিছু কৃষকের ঘরে গত মৌসুমের যে ধান রয়েছে তা গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি মন ধানে কমেছে এক থেকে দেড়শত টাকা। বতর্মান বাজারে প্রতি মন বিভিন্ন জাতের আমন ধান বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ১১০০ টাকায়। যা এক সপ্তাহ আগে বিক্রি হয়েছে ১০৫০ থেকে ১২০০ টাকায়। মাঠেই বোরো ধান ও গোলায় জমানো ধানের ন্যায্য মুল্যে না পাওয়ায় পরিবার পরিজনের জন্য খুব বেশী প্রয়োজনীয় ছাড়া খুশির ঈদের কেনা-কাটা করতে পারছেন না নীলফামারীর প্রান্তিক চাষীরা। ফলে এখনো জমে উঠেনি গ্রামাঞ্চলে ঈদের বাজার।
নীলফামারী সদরের ইটাখোলা ইউনিয়নের বর্গা চাষী এনতাজ আলী জানান, বোরো ধানের খেতে এখন কীটনাশক প্রয়োগ করতে হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজারের কীটনাশকের দোকান থেকে বাকিতে নিতে হয়েছে। অপরদিকে আলুর বাজার না পাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। হাতেও টাকা নেই, তাই ঈদের কেনাকাটা করা কষ্টকর হয়েছে। তবু ছেলেমেয়েদের মুখের দিকে তাকিয়ে মহাজনের কাছে টাকা কর্জ নিয়ে যৎসামান্য কেনাকাটা করবো।
জলঢাকা উপজেলার বালাগ্রাম ইউনিয়নের কৃষক আতিয়ার রহমান জানান, সপ্তাহখানেক আগেই দূর-দূরান্তে থাকা ছেলেমেয়ে ও নাতি-নাতনিরা ঈদ করতে বাড়িতে এসেছে। সবাই মিলে ঈদ উৎসবের জন্য গোলাঘরে থাকা আমন ধান কম দামে বিক্রির টাকায় নাতি-নাতনিদের জন্য নতুন জামা কেনা হয়েছে। টাকার সঙ্কটে মেয়ের জামাইকে মনের মতো উপহার দিতে পারিনি। মোটকথা ঈদে মেয়ে-মেয়ের জামাই ও নাতি-নাতনিদের নতুন পোশাক কিনে দেওয়ার রীতিতে এবার পরিবর্তন হয়েছে।
সৈয়দপুর শহরের ঢাকা গার্মেন্টসের মালিক মিলন হোসেন জানান, এবারে দোকানে কৃষকদের আনা-গোনা নেই বললেই চলে। কারন মাঠে ধান থাকায় কৃষকের হাতে টাকা নেই। গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে ধান। এবার সেই ধান পড়ে রয়েছে মাঠে। ফলে কৃষকের মুখে হাসি নেই। এবার কৃষকের কষ্টের ঈদ হবে। ভালো খাবার ও বাচ্চাদের জন্য কাপড় কেনার সামর্থ্য হবে না কৃষকের। তাই ঈদ আনন্দ নেই এবার কৃষকের ঘরে।
ধানের দাম না পাওয়ায় এবার ঈদের কেনাকাটায় পিছিয়ে নীলফামারীর ডিমলার কৃষকরা। উপজেলা সদর থেকে জেলা শহরে মার্কেটগুলোতে কৃষক এবং তাদের পরিবারের তেমন উপস্থিতি চোখে পড়ছে না। ডিমলা বাজারের কাপড়ের ব্যবসায়ী সারোয়ার আলম জানান, এ অঞ্চলের প্রধান ফসল ধান। সেই ধান ঘরে তোলার আগেই ঈদ আসায় মার্কেটগুলোতে এবার কৃষকের উপস্থিতি নেই।
দোকানে কথা হয় চর খড়িবাড়ীর কৃষক হাচিনুর রহমানের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আত্মীয়-স্বজনদের নতুন কাপড় দেওয়ার রেওয়াজ দীর্ঘদিন থেকে প্রচলিত থাকলেও এবারে অর্থের অভাবে তা দিতে পারছি না; এই কষ্ট কোনোদিনই ভুলতে পারব না।
বাংলাদেশ কৃষকলীগ নীলফামারী জেলা শাখার আহবায়ক ইয়াহিয়া আবিদ জানান, এক সপ্তাহের মধ্যে এ অঞ্চলে ধান কাটা শুরু হবে। তাছাড়া কৃষকদের অন্যান্য ফসল যেমন ভুট্টা, মরিচ, বেগুন, কুমড়ো সহ নানা ফসলের চাষাবাদ রয়েছে। অপরদিকে সরকারে প্রণোদনায় কৃষকরা সার. বীজসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার আওতায় রয়েছে। তাই ধান মাঠে থাকায় কৃষকদের ঘরে ঈদের খুশি ম্লান হয়ে উঠেছে-এটা সঠিক নয়।